কেন বন্ধ হতে যাচ্ছে অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ ?

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মানুষদের মধ্যে প্রায় সকলেই অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ নামটির সাথে পরিচিত। এক সময়ে অনলাইন গেইম খেলা ও ভিডিও দেখার জন্য সর্বাধিক ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় প্রযুক্তি বা প্ল্যাটফর্ম ছিল এই অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ। শুধু যে জনপ্রিয় তা নয় বেশ কড়া সমালোচনাতেও ছিল এর নাম। বিভিন্ন ধরণের ক্রটির কারণে এটির জনপ্রিয়তা দিন দিন কমেছে। বর্তমান সময়ে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। যেখানে ২০১৪ সালের দিকে ডেস্কটপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারী এই ফ্ল্যাশ ব্যবহার করত সেখানে বর্তমানে এর ব্যবহারকারী ৫ শতাংশেরও কম। ২০১৭ সালের ২৫ শে জুলায় অ্যাডোবি তাদের নিজস্ব ব্লগে একটি পোস্টে ঘোষনা দিয়েছিল তারা ২০২০ সালের মধ্যে ফ্ল্যাশকে পুরোপুরি বন্ধ করে দিবে। কিন্তু কি এমন কারণে এত জনপ্রিয় একটি প্ল্যাটফর্মকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে ? নিশ্চয় আপনার মনেও একই প্রশ্ন জাগছে। তাহলে চলুন এখন এই কারণটি জেনে নেয়া যাক। তবে তার আগে আমরা এডোবি ফ্ল্যাশ সম্পর্কে ভালভাবে বিস্তারিতভাবে জেনে নেব। তাহলে হয়ত এটি বন্ধ হওয়ার কারণটি বুঝতে সুবিধা হবে।

অ্যডোবি ফ্ল্যাশের সমাপ্তি

অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ কী ?

অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ নামে পরিচিত হলেও এর নাম কিন্তু সর্বপ্রথম ফিউচারস্প্ল্যাস এনিমেটর ছিল। কারণ এটি তৈরী করেছিল ফিউচারস্প্ল্যাস মাল্টিমিডিয়া কোম্পানী এবং এটি তাদেরই দেয়া নাম। এর আরেকটি নামও ছিল। ১৯৯৭ সালে ম্যাক্রোমিডিয়া কোম্পানী ফ্ল্যাশসহ পুরো ফিউচারস্প্লাস কোম্পানীটিকেই কিনে নিয়েছিল। তখন এর নামকরণ করা হয়  ম্যাক্রোমিডিয়া ফ্ল্যাশ। এরপর সর্বশেষ অ্যাডোবি ২০০৫ সালে এটিকে কিনে নেয় এবং এরপর থেকেই এটি অ্যাডবি ফ্ল্যাশ নামে পরিচিত। অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ মূলত একটি মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যা এনিমেশন,বিজ্ঞাপন,গেইম ও ওয়েব পেজে অডিও বা ভিডিও যোগ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ওয়েব এপ্লিকেশন তৈরীতেও এটি ব্যবহৃত হয়। এসব ছাড়াও এটি একই সাথে ভেক্টর ও রাস্টার গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করতে পারে এবং অডিও ও ভিডিও স্ট্রিমিং এর সুবিধাও দিতে পারে। ফ্ল্যাশের সাধারণ ফাইলগুলোর জন্য .swf এবং ভিডিও ফাইলের জন্য .flv এক্সটেনশন ব্যবহৃত হয়। এটি সম্পর্কে এতটুক জানলেই হবে আশা করি। তাহলে এখন জেনে নেয়া যাক এটি আসলে কী কারণে এত জনপ্রিয় থেকে ধিরে ধিরে সমালোচিত হয়ে শেষ পর্যন্ত বন্ধ হতে যাচ্ছে।

কেন এটি বন্ধ হচ্ছে ?

এটি বন্ধ হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কারণ হল কোডিং ও সিকিউরিটি সমস্যা,বিখ্যাত স্টিভ জবসের অভিযোগ সমালোচনা নিয়ে চিঠি,এইচটিএমএল৫ এর মত উন্নত প্রযুক্তি ইত্যাদি। এখন এই কারণগুলো বিস্তারিতভাবে জানা যাক।

অ্যাডোবি ফ্ল্যাশের বিদায়

কোডিং ও সিকিউরিটি সমস্যা

এই বিষয়ে ২০১৬ সালের ৩১ শে মার্চ জাপানের জনপ্রিয় ইন্টারনেট সিকিউরিটি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রো জানায় অ্যাডোবি ফ্ল্যাশে রয়েছে শক্তিশালী ভাইরাস। এসব ভাইরাস কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য অনেক বিপদজনক। কেননা এই ভাইরাস কিছু ভয়েস কৌশল ব্যবহার করে কম্পিউটারকে লক করে দিতে পারে এবং লক করার জন্য যেসব সাইট এ যাওয়া দরকার সেসব সাইটে ব্রাউজারকে নিয়ে যেতেও সাহায্য করবে এই ভাইরাস। গবেষকদের মতে এই লক খোলার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে প্রায় ২০০ থেকে ৬০০ মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ১৬ থেকে ৫০ হাজার বাংলাদেশী টাকা খরচ হবে। এর কোডিং দূর্বলতার কারণে এটি হ্যাকারদের কাছে কম্পিউটারে আঘাত হানার জন্য অনেক সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যার ফলে ইউটিউবের মত বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যাডোবি ফ্ল্যাশকে বিদায় জানিয়েছে।

বিল গেটস এর চিঠি

এ্যাপল কখনোই ফ্ল্যাশকে সমর্থন করেনি। এর ডিভাইসগুলোতে কখনোই ফ্ল্যাশ ব্যবহৃত হয়নি। এর কারণ হিসেবে এবং ফ্ল্যাশকে বন্ধ করা কেন উচিত এ প্রসঙ্গে ২০১০ এর এপ্রিলে প্রয়ত এ্যাপল এর প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ একটি খোলা চিঠিতে ফ্ল্যাশকে নিয়ে প্রাথমিক ৬টি অভিযোগ করেন।অভিযোগগুলো হল ঃ-

  1. অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ মালিকানাধীন- অ্যাডোবি ফ্ল্যাশ সম্পূর্ণ মালিকানাধীন। এটি শুধুমাত্র অ্যাডোবি থেকেই পাওয়া যায় এবং এর মূল্য নির্ধারণ একমাত্র কর্তৃপক্ষের হাতে।
  2. নতুন ভিডিও ফরম্যাটগুলি অনেক বেশি উন্নত এবং জনপ্রিয়- এ্যাপল এর মোবাইল ডিভাইসগুলো ফ্ল্যাশ ভিডিও দেখতে ও ফ্ল্যাশ গেইমস ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু এর থেকেও উন্নত মানের ভিডিও ও গেইমস এ্যপল ডিভাইস সমর্থন করে।
  3. ফ্ল্যাশে নিরাপত্তার ঘাটতি এবং ভাল সার্ভিস দেয় না- ২০০৯ সালে আমেরিকান সফটওয়্যার ভিত্তিক কম্পানী স্যাম্যান্টেক  সবচেয়ে খারাপ নিরাপত্তা দেয়ার রেকর্ডগুলির জন্য ফ্ল্যাশকে হাইলাইট করেছে।ম্যাক ক্র্যাশ করার এক নম্বর কারণ ফ্ল্যাশ।
  4. ফ্ল্যাশ ব্যাটারি ধ্বংশকারী- ফ্ল্যাশ ডিকোডিংগত কারণে অনেক বেশি ব্যাটারি লাইফ ব্যবহার করে ফলে খুব দ্রুত ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়।
  5. এটি টাচ সাপোর্ট করে না- ফ্ল্যাশ মূলত কম্পিউটারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। যার ফলে  এ্যাপলের টাচ ডিভাইসগুলো অনেক সমস্যায় পড়ে।
  6. অ্যাপল আইফোন  অ্যাপসের পরিবর্তে ফ্ল্যাশ অ্যাপস লেখার জন্য ডেভেলপারদের চায় না ।

এইচটিএমএল৫ এর মত উন্নত প্রযুক্তি

অ্যাডোবির প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট গোবিন্দ বালাক্রিশনান জানিয়েছিলেন,তারা ফ্ল্যাশ বন্ধ করছেন কারণ এখন এইচটিএমএল ৫ এর মতো উন্নত প্রযুক্তিগুলো যথেষ্ট ভাল সার্ভিস দিতে পারবে এবং ফ্ল্যাশ প্লেয়ারের উপযোগী বিকল্প সেবা প্রদান করতে সক্ষম। এছাড়াও এইচটিএমএল৫ এর সুবিধা হলো- ওয়েবপেজে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের জন্য ব্যবহারকারীকে ডেডিকেটেড প্লাগ-ইন ইন্সটল এবং আপডেট করতে হয় না এবং প্রায় সব ধরণের ডিভাইস সমর্থন করে।

উপরোক্ত কারণগুলো অ্যাডোবি ফ্ল্যাশকে বর্তমানে অন্তিমকালে নিয়ে এসেছে। এখন এটি পুরোপুরি বন্ধ হওয়া অবশ্যক। আসছে বছর ২০২০ সালেই ইতি ঘটবে এক সময়ের জনপ্রিয় মাল্টিমিডিয়া প্ল্যাটফর্ম অ্যাডোবি ফ্ল্যাশের।

উপরোক্ত বিষয়টি পছন্দ হলে লাইক দিন, উপকারী মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

comments