যে ১৫টি ভুলের কারণে আপনার স্মার্ট ফোনটি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে

আপনার প্রিয় জিনিস গুলোর যদি লিস্ট করতে বলা হয় তাহলে স্মার্ট ফোনটিও নিশ্চয় এই তালিকায় থাকবে। অনেকের হয়তো এই লিস্টের প্রথম নামটি হবে Smart Phone। স্মার্ট ফোন গুলো যেমন শখের তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাতেও স্মার্ট। বর্তমান স্মার্ট ফোনগুলো যে হারে আপডেট হয়ে উঠছে তাতে নিশ্চিত হয়েই বলা যায় আগামীর অনেক বড় বড় কাজগুলোও এর মাধ্যমে করা সম্ভব হয়ে উঠবে। আপনি জানেন কি এই ডিভাইসটির ক্ষতি আপনি নিজেই করছেন তাও আবার নিজের অজান্তেই? পাঠক, আজ আমি আপনাদের এমন কত গুলো ভুল কাজের সাথে পরিচয় করে দিবো যেগুলোর জন্য আপনার ফোনের  স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।

নিম্ন তাপ পরিহার

কোন কিছু বেশিও ভালো না তেমনি কোন কিছু কম সেটাও ভালো না। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বেশি ভারি অ্যাপস কিংবা গেম খেলা ঠিক না। এতে ফোন তার কম্পোনেন্ট গুলোকে সচল রাখতে বেশি ব্যাটারি পাওয়ার নষ্ট করে। বেশি শীতে ফোনটি জ্যাকেটের পকেটে রাখুন। আমরা অনেকেই এতোটাই বেখেয়ালি হয়ে যাই যে মাঝে মাঝে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে আবার রাখার সময় ভুলে মোবাইলটাই রেখে দিই (আমি এই গোত্রের প্রাণী 😛 )  কিংবা হাত ফোঁসকে মোবাইল পানিতে ফেলে দিই। এক্ষেত্রে বেশি চিন্তা না করে দ্রুত ফোনের সব এক্সটারনাল (ব্যাটারি, সিম, এসডি কার্ড) গুলো খুলে ফেলুন আর হাল্কা রোদে কিছু চাউলের উপর শুকাতে দিন। ভাগ্য ভালো থাকলে ফোনকে বাঁচাতে পারেন।

কত % চার্জ থাকতে পুনরায় চার্জ দিবেন?

আমরা অনেকেই মনে করি মোবাইলের ব্যাটারি চার্জ দেয়ার উত্তম সময় হলো মোবাইলকে জিরো পারসেন্ট করে আবার চার্জ দেয়া। কিন্তু এই ধারণাটা বর্তমান মোবাইল ব্যাটারির ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য নয়। বর্তমান সময়ের লি-আয়ন এবং polymer battery গুলোকে আপনি যখন খুশি চার্জ দিতে পারেন এতে তেমন কোন সমস্যা নাই। তবে আপনার ফোন ব্যাটারি সুস্থ রাখতে ১০-২০% চার্জ থাকা অবস্থায় চার্জ দিতে পারেন।

সব সময় চার্জে দিয়ে রাখা

আমরা সবাই কম বেশি বুঝি যে মোবাইল সব সময় চার্জ দিলে ব্যাটারির এবং মোবাইলের উভয় ক্ষতি হয়। কিন্তু এই তত্ত্বটাও এই বর্তমান সময়ে আর টিকে না। মোবাইল এবং চার্জার গুলোতে বর্তমানে চার্জ ওভার ফ্লো হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য চার্জ কন্ট্রোলার কম্পোনেন্ট যুক্ত করা থাকে। কিন্তু সব কিছুরই একটা ধৈর্যের সীমা থাকে। তেমনি মাত্রারিক্ত সব সময় চার্জে দিয়ে রাখলে এই কম্পোনেন্ট গুলোর কাজের দক্ষতা কমতে থাকে এবং এক সময় ব্যাটারি ও মোবাইল দু’টিই ক্ষতির মুখে পড়ে। সুতরাং চার্জ সব সময় না দিয়ে রাখাই ভালো।

সস্তা চার্জার কেনা

আমরা সবাই কম দামে কোন কিছু কিনতে পারলে নিজেকে বেশ চালাক ভাবি। আমাদের ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর ৯০%ই মেড ইন চায়না। চায়নিজ প্রডাক্টের মূল্য এবং মান কেমন তা নিশ্চয় এখানে বলার প্রয়োজন নেই। এই চাইনিজ প্রডাক্টের চেয়েও অনেক সস্তা এবং লো-কোয়ালিটির চার্জার বর্তমানে বাজারে পাওয়া যায়। আমরা একটু টাকা সেভ করতে এই সস্তা খারাপ চার্জার গুলো কিনে নিয়ে যাই। কিন্তু এই সস্তার প্যাঁচে আপনি সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে পারলেও আপনার স্মার্ট ফোনটির ক্ষতি করছেন। কারণ সস্তা চার্জার গুলোতে খুব লো-কোয়ালিটির কম্পোনেন্ট ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। এর ফলে সঠিক নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্পিয়ার, ভোল্টেজ সাপ্লাই হয় না। তাছাড়া চার্জ কন্ট্রোলার খুব খারাপ মানের থাকে এবং শক প্রতিরোধী কম হয়। এসব কারণে মোবাইলের ব্যাটারির ক্ষতির পাশাপাশি আরো বিপদ ঘটতে পারে যেমন শর্টসার্কিটের মাধ্যমে আগুন লেগে যাওয়া। তাই আমি বলবো বেশি সস্তা না খুঁজে একটু খরচ করে হলেও ভালোটা কিনুন আর ভালো থাকুন।

ফাস্ট চার্জার ব্যবহার

ফাস্ট চার্জ করতে সবারই ভালো লাগে। কিন্তু মনে রাখবেন তাড়াহুড়া কাজ কখনোই ভালো না। তেমনি ফাস্ট চার্জ হওয়ার জন্য আল্ট্রা ফাস্ট চার্জার পরিহার করুন কেননা এটি আপনার মোবাইলের ব্যাটারি ও স্ক্রিন ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণত যেগুলো চার্জার ১ ঘন্টার কম সময়ে চার্জ করে সেগুলো পরিহার করুন।

চার্জিংয়ের সময় ব্যাক কাভার খুলে রাখা

আপনার মোবাইলকে সাজাতে হোক কিংবা সুরক্ষা দেয়ার জন্য হোক নিশ্চয় একটা ব্যাক কাভার ব্যবহার করেন। যাইহোক, চার্জ দেয়ার সময় আপনার মোবাইলের ব্যাক কাভার খুলে চার্জ দিন। এতে আপনার ব্যাটারি ও মোবাইলে ক্ষুদ্র কম্পোনেন্ট গুলো ভালো থাকবে। কেননা আমরা যখন ফোনে চার্জ দেই তখন এতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড উৎপন্ন হয় যা মোবাইলের দুর্বল কম্পোনেন্ট গুলোর জন্য ক্ষতিকর। ব্যাক কাভার থাকলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ফোনের বাইরে খুব একটা বের হতে পারে না।

ব্যাটারিকে সম্পূর্ণ ডিসচার্জ এবং চার্জ করা

মাসের ৩০ টা দিন আমরা যত্রতত্র ভাবে চার্জ এবং ডিসচার্জ করি। কিন্তু আপনি যেমনই করুন না কেন, প্রতি ৩ মাসে অন্তত ১ বার সম্পূর্ণ ডিসচার্জ করুন আপনার ব্যাটারি এবং সেই সাথে ১০০% চার্জ করুন। এতে ব্যাটারির গুণাগুণ ভালো থাকে।

উচ্চ তাপ পরিহার

উচ্চ তাপে ব্যাটারি

আমরা অনেকেই খেলাধুলা করার সময় কিংবা কাজের মোবাইলটা এমন জাগায় রেখে দিই যেখানে কিছুক্ষণ পর প্রচণ্ড রোদ এসে পড়ে। এতে আমাদের অজান্তেই মোবাইলের ব্যাটারি তাপ শোষণ করে ব্যাটারির গুনাগুন  নষ্ট করে ফেলে। আবার আমরা অনেকেই রান্নার সময় মোবাইল রান্না ঘরে নিয়ে গিয়ে চুলার আশে পাশেই রাখি ভুল বসত। এগুলো পরিহার করে চলুন।

 

ব্রাইট ওয়ালপেপার ও অতি ব্রাইটনেস

আমরা শখ করে অতি ব্রাইট ওয়ালপেপার ব্যবহার করি কিংবা লাইভ ওয়ালপেপার ব্যবহার করি। আবার ফোনের ব্রাইটনেস ফুল করে রাখি। যদি আপনি এখনো তাই করেন তাহলে আজ এখনই তা পরিহার করুন। এগুলো আপনার ব্যাটারির লাইফটাইম কমিয়ে দেয়। আপনি ব্রাইটনেস ৩০-৪০% রাখলেই যথেষ্ট। আর বাহিরে থেকা অবস্থায় অটো ব্রাইটনেস ব্যবহার করুন। লাইভ ওয়ালপেপারের পরিবর্তে সাভাবিক উজ্জ্বল কিংবা সাদা কালোতে হাল্কা অন্যান্য কালারের wallpaper ব্যবহার করুন।

ঝড় বজ্রপাতের সময় ফোন চার্জ দেয়া

বজ্র পাত

ঝড় ও বজ্রপাতের সময় মোবাইল চার্জ দেয়াটা হাই রিস্কের। কারণ এই সময় কারেন্ট আপডাউন করে সেই সাথে বাহিরের পরিবেশের প্রভাব ডিভাইসে পরে। তাছাড়া বজ্রপাতের হাই গিগা ভোল্ট খুব সহজেই ইলেকট্রিক ট্রান্সমিশন ওয়্যার গুলোকে প্রভাবিত করে। শুধু মোবাইল নয়, যেকোন ডিভাইস এই সময় গুলোতে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা অতি প্রয়োজন।

ডিসপ্লের যত্ন

স্মার্ট ফোন মানেই টাচ স্ক্রিন। আমরা সারাক্ষণ এই স্ক্রিনে টাচ করে কাজ (পড়ুন অত্যাচার 😛 ) করি। সুতরাং এটাতে দাগ হয়ে ময়লা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু অতি ভালোবেসে পরিষ্কার করতে গিয়ে গ্লাস ক্লিনার ব্যবহার করবেন না। এতে অ্যামোনিয়া থাকে। কোন তরলই ব্যবহার করা ঠিক না। ডিসপ্লে পরিষ্কার করুন নরম কাপড় দিয়ে। মোবাইলের পোর্ট গুলো পরিষ্কার করুন টুথ পিক দিয়ে সাবধানে।

সাইড কেসিং ব্যবহার

ফোনের ব্যাক কাভার ব্যবহারে তাপ ছড়িয়ে যেতে পারেনা ফলে ফোনের তাপ বৃদ্ধি পায় আর এর জন্য ফোন ধীরে ধীরে স্লো হয়ে যায়। সমাধানে সাইড কেসিং ব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে আপনার মোবাইলের সৌন্দর্য্য যেমন ফুটে উঠবে তেমনি আঘাত থেকেও রক্ষা পাবে আর ফোনও কম গরম হবে।

ড্রাইভিং এর সময় ফোন ব্যবহার করা

ড্রাইভিং এর সময় কোন ভাবেই ফোন ব্যবহার করা ঠিক না। আপনার নিজের ক্ষতি সাথে ফোনেরও। তাছাড়া ফোন ড্রাইভিং এর সময় নেটওয়ার্ক পাবার জন্য বেশি ব্যাটারি খরচ করে ফলে ফোন গরমও হয়ে উঠে তাই এই সময় ফোনে আর চাপ প্রয়োগ করাটাও ঠিক না।

অ্যাপস আপডেট করা

আমরা ফোন কিনেই হুটহাট করে বেশি যত্ন নিতে ঘন ঘন আপডেট করি। এসব ঠিক না। আগে সেই Update App সম্পর্কে রিভিউ পড়ে দেখুন নতুন কিছু এসেছে কি না তারপর আপডেট করুন। নইলে আপনি অপ্রয়োজনীয় আপডেট দিয়ে ফোনের ক্ষতি করবেন। তাছাড়া সব আপডেটই যে আপনার ফোন সাপোর্ট করবে তা নয়।

ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার

এখন কম বেশি সকল নতুন মোবাইলেই ফ্রি ক্লাউড স্টোরেজ দিয়ে থাকে। সুতরাং একে কাজে লাগান। আপনার প্রয়োজনীয় সকল ডাটা, ফোন নাম্বার, ছবি, ভিডিও, ফাইল এতে রেখে দিন আর সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকুন কেননা বলা যায় না কখন আপনার মোবাইল স্বর্গে 😛 (পড়ুন চোরের হাতে) চলে যেতে পারে।

আজকের পোস্টটিতে ফোনের কিছু সাধারণ যত্ন নিয়ে লিখলাম। যত্ন গুলো সাধারণ হলেও আমরা বেশির ভাগ মানুষই তা মানি না, ফলে ফোনের সমস্যা নিয়ে কিছুদিন পর পরই সার্ভিসিং এ যাই। একটু সতর্ক হোন আর এই সাধারনণ যত্ন গুলোই ফলো করুন দেখবেন অসধারণ ফল পাচ্ছেন। আপনার যদি এই সম্পর্কে আরো কিছু জানানোর থাকে তাহলে নির্দ্বিধায় কমেন্টে জানিয়ে দিন। আর পোস্টটি কেমন হয়েছে তাও জানাবেন অবশ্যই।

উপরোক্ত বিষয়টি পছন্দ হলে লাইক দিন, উপকারী মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

comments

S.M. Sojib Ahmed

উপরোক্ত আর্টিকেলটি লিখেছেন | Email: smsojibahmed@gmail.com | Facebook: https://www.facebook.com/sojib.ahemed.5