ম্যালওয়্যার কি? ভাইরাস বা স্পাইওয়্যার থেকে কম্পিউটারকে বাঁচাতে আপনার যা করা উচিত

ম্যালওয়্যার, ভাইরাস কিংবা স্পাইওয়্যার বেশ পরিচিত নাম আর বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে এগুলোর নাম শুনেনি এমন মানুষ পাওয়াটা দুর্লভ। আমরা প্রায়শই শুনে থাকি মোবাইল বা কম্পিউটার ডিভাইস ম্যালওয়ার, ভাইরাস কিংবা স্পাইওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। আসলে এটা বুঝা বেশ কঠিন যে আমাদের ডিজিটাল ডিভাইস গুলো কিভাবে এগুলো দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। সাধারণত অনলাইনের মাধ্যমে বেশি আক্রান্ত হওয়ার কথা শুনা গেলেও অফলাইনে থাকা ডিভাইস গুলোও এগুলো দ্বারা খুব সহজেই আক্রান্ত হতে পারে যেকোনো ভাইরাস যুক্ত সফটওয়্যার ইন্সটল কিংবা ইউএসবি স্টোরেজ ফাইল ট্রান্সফার করার মাধ্যমে। আর এগুলো সাভাবিক ভাবেই আমাদের ডিভাইস গুলোর জন্য চরম বিপদজনক। বিশেষ করে আমরা যারা অনলাইন জগতে একটু বেশিই চলাফেরা করি তাদের অবশ্যই বুঝতে হবে কোন কোন মাধ্যমে এগুলো দ্বারা আক্রান্ত হতে পারি। তাই অনলাইন সিকিউরিটিসমূহ যেনে রাখা এবং ম্যালওয়ার, ভাইরাস ও স্পাইওয়্যার প্রতিরোধ করা বিষয় জানা অতি প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে ভয়াবহ সংবাদ গুলোর অন্যতম হলো সাইবার অ্যাটাক। এই অ্যাটাক গুলো এতোটাই ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে যে প্রায় প্রতি মাসেই কোন না কোন বড় ধরণের সাইবার এটাক হয়েই চলেছে যার ভুক্ত ভোগী হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠান সহ ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুলোও আক্রান্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে WannaCry এর ঘটনা উন্নত দেশ গুলোকে এখনো বিপদের মধ্যে রেখেছে। এছারা Petya/NotPetya ঘটনা গুলো তো আছেই যেগুলো Maersk, Equifax, Deloitte মত তথ্য সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান গুলোকে আক্রমন করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। বীমা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন যে, ২০১৭ সালে সাইবার ক্রাইম বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করিয়েছে এবং ২০২১ সালের মধ্যে মোট ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বেশীরভাগ হামলা বড় সংস্থা গুলোকে লক্ষ্য করে সংগঠিত, তবে অনেক হুমকি বিশেষ ব্যক্তিদের উপরও হয়ে আসছে। এর মানে হল যে আধুনিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট মাধ্যমে খুব ভালো মানের প্রতিরক্ষামুলক ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যকীয়।

আরো পড়ুন: ভাইরাস ও হ্যাকার থেকে কম্পিউটারকে রক্ষার ৬টি অব্যার্থ কৌশল

ইন্টারনেট জগতে নবাগতদের উদ্দেশ্য করে আমাদের এই পর্বে থাকছে অনলাইন জগতে প্রধান তিন হুমকি ম্যালওয়ার, ভাইরাস এবং স্পাইওয়্যার সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা ও এগুলো থেকে পরিত্রাণের উপায় সমূহ।

ম্যালওয়ার

আপনি সম্ভবত ম্যালওয়ার শব্দটি অনেক শুনেছেন, তবে নির্দিষ্ট কোন হুমকিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। আপনি জানে থাকতে পারেন যে ম্যালওয়ার একটি নির্দিষ্ট ধরণের হুমকি নয় বরং সব ক্ষতিকারক বা অবাঞ্চিত বিপদজনক প্রোগ্রাম সম্বলিত একটি শব্দ যার মধ্যে সকল ক্ষতিকারক সফটওয়্যার, ভাইরাস, Ransom-ware, Worms, Trojan Horses,স্পাইওয়্যার, এবং অন্যান্য অনেক বিপদজনক অপ্রয়োজনীয় প্রোগ্রাম রয়েছে। Malware শব্দটির অর্থ Malicious Software. মানে ক্ষতিকারক কম্পিউটার প্রোগ্রাম। যে সকল প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার টুল কম্পিউটারের বিভিন্ন ক্ষতি সাধন করে থাকে সেগুলোকেই ম্যালওয়্যার বলে। আমরা সচরাচর ৩-৪ প্রকার ম্যালওয়্যারের সম্মুখিন হয়ে থাকি।

ম্যালওয়্যার কি

ম্যালওয়্যার থাকতে পারে আপনার ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা যেকোনো সফটওয়্যার এর মধ্যেও। এমনকি যেকোনো প্রকার বৈধ সফটওয়্যারের মধ্যেও থাকতে পারে। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কিছু বছর আগে SONY কম্পানির একটি সফটওয়্যারের কথা। যেটি তৈরি হয়েছিল কপিরাইট নির্মূল করার লক্ষ্যে। কিন্তু পরে জানা গিয়েছিল এর মধ্যে ম্যালওয়ার রয়েছে যা গোপনে ইন্সটল হয় ব্যাবহারকারীদের ডিভাইসে। এটি যেহেতু গোপনে ডিভাইসে ইন্সটল হতে পারে সেহেতু বোঝাই যাচ্ছে এটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে নির্দিষ্ট লক্ষ্য করে রাখা প্রতিষ্ঠানের জন্য।

সুতরাং, যখন আপনি ম্যালওয়্যার অপসারণ সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন – যেমন Malwarebytes । এসব সফটওয়্যার যদি এটা বলে যে ম্যালওয়্যার মোকাবেলা করবে তাহলে বুঝবেন এটা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারবেনা বরং তা আপনার ডিভাইসে ছড়িয়ে পরার হুমকি থেকে প্রতিরোধ করবে।

ভাইরাস

নাম শুনেই বুঝতে পারছেন যে এটা কি জিনিস। একটি প্রাণী দেহে জৈবিক উপায়ে ভাইরাস যেমনটি ভাবে কাজ করে ঠিক তেমনি কম্পিউটারে ভাইরাসটিও একইভাবে কাজ করে। একবার দূষিত ফাইলটি ইন্সটল করা হলে, ভাইরাসটির কোডটি দ্রুত অন্যান্য প্রোগ্রামে ছড়িয়ে  কম্পিউটার কোড প্রতিস্থাপন করা শুরু করে। এখন আপনার প্রশ্ন জাগতেই পারে যে কেন কেও আপনার কম্পিউটার এ ভাইরাস ছড়িয়ে দিবে? আচ্ছা বলছি তাহলে, একটি ভাইরাস (ransomware) অপসারণ করার জন্য অর্থের বিনিময়ে ব্ল্যাকমেইলিং করে থাকে, যেমন একজন বিরোধীদের সাইট বন্ধ বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার মত অনৈতিক উদ্দেশ্য। একটি ভাইরাস আক্রমণের উদ্দেশ্য বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, অনেক anonymous coders রয়েছেন যারা ভাইরাস তৈরি করেন কিছু মজা করার উদ্দেশ্যে যেগুলো স্বভাবতই ভয়ানক বিপদজনক মজা হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে কিংবা রোমাঞ্চকর পরিবেশ উপভোগ করতে এসব করা হয়ে থাকে। তবে সব সময় যে অসৎ উদ্দেশে ভাইরাস তৈরি করা হয় তেমনটা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই নতুন সিস্টেম বা প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার এর ত্রুটি বের করতেও ভাইরাস বানানো হয়ে থাকে।

virus attack

ভাইরাস ভিত্তিক হামলার অপরাধীরা সাধারণভাবে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে তাদের শিকারকে ম্যালওয়ার সক্রিয় করার জন্য তৎপরতা চালায়। তারা মাইক্রোসফট সিকিউরিটি বা অনুরূপ ক্লোন সংস্থা হতে ফেক একটি ইমেইল পাঠাতে পারে, তারা বলে যে টার্গেটের কম্পিউটারে বেশ কয়েকটি ভাইরাস পাওয়া গেছে এবং তারা একটি ম্যালওয়ার অপসারণ প্রোগ্রাম সক্রিয় করতে একটি লিঙ্ক এ ক্লিক করতে বা ডাউনলোড করতে বলবে। যাইহোক, একবার লিংকটি ক্লিক করলে সফটওয়্যার ইন্সটল হয়ে যায়, এবং কম্পিউটার তখন সত্যিই সংক্রামিত হয়। এটি একটি ফিশিং স্ক্যাম হিসাবে পরিচিত। কখনও কখনও আক্রমণকারী মোবাইল ফোন বা আপনার সিস্টেম অ্যাক্সেস নিয়ে আপনাকে প্রতারিত করার চেষ্টা করবে। আমরা আপনাকে সেরা উপদেশ দিবো যে , যদি কখনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক মেইল আসে আপনার ইনবক্সে তাহলে কখনই যেন ক্লিক না করেন। আর যদি তারপরেও ক্লিক করতে একান্তই ইচ্ছে হয় তাহলে সেই কম্পানির সফটওয়্যার নিতে সরাসরি ভিন্ন একটি ট্যাব খুলে তাদের ওয়েবসাইটটি লিখে সার্চ করে ভিজিট করুন। ওয়েব সাইটে দেয়া যোগাযোগ অপশনে গিয়ে যোগাযোগ করে দরকার হলে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। আর তারপরেও যদি ভুল করে অনাকাংখিত লিংক এ ক্লিক করে ফেলেন এবং যদি মনে হয় যে আপনি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন তাহলে একটি ভালো মানের  ম্যালওয়ার রিমুভাল সফটওয়্যার ব্যাবহার করতে পারেন। ভাইরাস আপনার ডিভাইসে বিভিন্ন উপায়ে সংক্রমিত হতে পারে। আপনার ব্যাবহৃত বা অন্য কারো ইউএসবি ডিভাইস গুলো থেকে খুব সহজেই ছড়িয়ে যেতে পারে। আর একবার ছড়িয়ে গেলে তার উৎস খুজে বের করা প্রায় অসম্ভব কারণ আগেই বলেছি ভাইরাস তার অনুরুপ প্রোগ্রাম নিজে থেকেই তৈরি করে ছড়িয়ে দিতে পারে। আর তাই বিশেষ সমস্যা হলে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ আইটি বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পারেন কিংবা পুলিশের সহায়তা নিতে পারেন। (আপনি বাংলাদেশের বাসিন্দা হয়ে থাকলে পুলিশের কাছে যাবার পূর্বে মাথায় হেলমেট পরে যাবেন [Just kidding])। এছাড়াও বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন যেমন Eset, Avast, Kaspersky, Avira, AVG, Panda Antivirus ইত্যাদি।

স্পাইওয়্যার

স্পাইওয়্যার নামটি থেকেই তার কাজ সম্পর্কে আংশিক ধারণা পাওয়া যায়। একবার ইন্সটল হলে আপনার ডিভাইসে থাকা সকল তথ্য অনায়াসেই অন্য কারো কাছে পাচার করে দিতে পারে খুব গোপনেই। এটি একবার ইন্সটল হলে সহজে বুঝাটাও কঠিন কারণ এটি গোপনে কাজ করে হ্যাকারদের কাছে আপনার বিভিন্ন তথ্য পাঠাতে থাকে। এর মাধ্যমে তাই খুব সহজেই ব্লাক মেইল করা সম্ভব যা মাঝে মাঝে প্রাণ নাশের কারণও হতে পারে। যদিও অধিকাংশ স্পাইওয়্যার তুলনামুলকভাবে ক্ষতিকর হয় না, তবুও কিছু কিছু স্পাইওয়্যার খুব মারাত্বক সিকিউরিটি রিস্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্পাইওয়্যার মূলত আপনার ইন্টারনেট সার্ফিং এর উপর নজরদারী করে এবং অ্যাড রিলেটেড ব্যাপারগুলোর সাথে সম্পৃক্ত থাকে। স্পাইওয়্যার একটি বৈধ কোড কিংবা সফটওয়্যারেও থাকতে পারে। যেমন ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেগুলোতে আমরা প্রায়শই ফ্রী সার্ভিস গুলো নিয়ে থাকি আর নিজেদের গোপনীয় তথ্য গুলোতে এক্সেসের অনুমতি দিয়ে থাকি। তারা খুব সহজেই আপনার ব্রাউজিং হিস্টরি চেক করে থাকে যেন তারা আপনার পছন্দমত অ্যাড দেখাতে পারে। মুলত ফেসবুক, গুগল বা মাইক্রোসফট থেকে শুরু করে প্রায় সব কোম্পানির নিজস্ব স্পাইওয়্যার প্রোগ্রাম রয়েছে যা দিয়ে তারা আপনার বিভিন্ন তথ্য (চ্যাট হিস্ট্রি, ব্রাউজিং হিস্ট্রি, পছন্দ/অপছন্দের বিষয়) হাতিয়ে নেয়।

কম্পিউটার ভাইরাস কি

 

স্পাইওয়্যার মাঝে মাঝে ট্রোজান হর্সের চেয়েও ক্ষতিকর হয়ে যায়, যখন এটা আপনার কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, ছবি, ইমেইল, ব্যাংক ইনফরমেশন সার্ভার কিংবা অন্য ব্যবহারকারীর কাছে পাঠিয়ে দেয়। স্পাইওয়্যার সাধারণত কম্পিউটারে সফটওয়্যার ডাউনলোডের সময়, অ্যাডঅনস ডাউনলোডের সময় এবং অধিকাংশ ফ্রিওয়্যার সফটওয়্যার কিংবা শেয়ার ওয়্যারের সাথে আপনার পিসিতে চলে আসে।  যদিও স্পাইওয়্যার এড সার্ফিং এর কাজেই বেশি ব্যবহৃত হয় তবুও নিজেকে নিরাপদ রাখতে একটু সাবধান আপনাকে হতেই হবে। তাছাড়া এন্টি স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার ব্যাবহার করেও পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।

সর্বশেষ ভাবনা

অনলাইন কিংবা অফলাইন ঝুঁকি গুলো সাধারণত একটির সাথে অন্যটি জড়িয়ে থাকে। তাই ঝুঁকি গুলো বুঝতে পারার প্রাথমিক পর্যায়েই তা নির্মূলে সচেষ্ট হতে হবে। এই পোস্ট এর মাধ্যমে কিছু অনলাইন ও অফলাইন ঝুঁকি গুলো নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। যদি কোন মন্তব্য থাকে এই বিষয়ে কিংবা সাহায্যের প্রয়োজন মনে করেন তাহলে অবশ্যই মন্তব্য করে জানাবেন, আমরা যথাসাধ্য আপনাকে সহায়তার চেষ্টা করবো।

উপরোক্ত বিষয়টি পছন্দ হলে লাইক দিন, উপকারী মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

comments

S.M. Sojib Ahmed

উপরোক্ত আর্টিকেলটি লিখেছেন | Email: smsojibahmed@gmail.com | Facebook: https://www.facebook.com/sojib.ahemed.5