ডিলিট করার পর ফাইলগুলো যায় কোথায়? পরে আবার কিভাবে পূনরুদ্ধার করা হয়?

হার্ড ডিস্ক, মেমোরি কার্ড, পেনড্রাইভ এগুলো ছাড়া আমাদের জীবন এখন অচল। এগুলোর গুরুত্ব সময়ের সাথে সাথে অত্যন্ত বেড়ে চলেছে। কত স্মৃতি, কত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে রাখি আমরা। এই মেমোরি গুলোর স্পেস আনলিমিটেড হয় না। তাই চাইলেও জীবনের সব স্মৃতি এতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। এই জন্য আমরা আমাদের অপ্রয়োজনীয় তথ্য/ডাটা গুলো ডিলেট করে মেমোরির স্পেস ফাঁকা করে আবার সেখানে নতুন তথ্য/ ডাটা ওভার রাইট করে সংরক্ষণ করি। কিন্তু কখনও ভেবেছেন কি, যখন এই তথ্য/ডাটা/ফাইল/ফোল্ডার গুলো ডিলেট করা হয় তখন আপনার ডিভাইসের মেমোরির কি কি পরিবর্তন হয়? কিভাবে তথ্য গুলো মুছে যায় যার কারণে সেখানে আবার নতুন তথ্য সংরক্ষণ করা যায়? কি হয় ডিলেট হওয়া তথ্য গুলোর? সেগুলো তো উড়ে হারিয়ে যায় না। জি, আমি জানি এখন আপনি অনেক কিছুই ভাবছেন। আচ্ছা চলুন এতো কষ্ট করে ভাবতে হবেনা আপনাদের। এজন্য প্রথমেই জানতে হবে মেমরি বা হার্ডড্রাইভ বা পেনড্রাইভে কিভাবে ফাইল সংরক্ষণ করা হয়!

যেভাবে তথ্য সংরক্ষণ/রাইট করা হয়

কম্পিউটার Hard disk এ কোন আলাদা আলাদা চৌম্বুক লোহা থাকে না, এতে সবগুলো একসাথে মিশে থাকে। প্রত্যেকটি তথ্যের বিট একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজানো থাকে, এবং এই প্যাটার্ন গুলো দিয়ে একটি গোলাকার পথ তৈরি হয় যাকে ট্র্যাক বলা হয়। প্রত্যেকটি ট্র্যাকে ক্ষুদ্রতর অংশ থাকে, যাকে সেক্টর বলা হয়। কোন সেক্টর গুলো ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোন গুলো এখনো ফাঁকা রয়েছে তা নির্ধারণ করার জন্য হার্ড ডিস্ক এর কাছে একটি ম্যাপ থাকে। উইন্ডোজ কম্পিউটারে এই ম্যাপকে ফাইল অ্যালোকেশন টেবিল বা এফএটি (FAT) বলা হয়।যখন আপনার কম্পিউটার কোন নতুন তথ্য সংরক্ষিত করতে চায়, তখন এটি ম্যাপ থেকে ফাঁকা সেক্টর গুলো খুজে বের করে। তারপর সেই সেক্টরে ডাটা Read/Write হেডকে পৌঁছিয়ে দেয় এবং রাইট করার কমান্ড দিয়ে দেওয়া হয়।

যেভাবে তথ্য রিড করা বা দেখা হয়

Data read করার জন্য ঠিক রাইট করার উল্টা প্রসেস খাটানো হয়। এতো ছোট জায়গার মধ্যে এতো বিশাল পরিমাণের তথ্য ধারণ করার ক্ষমতা রাখার জন্য হার্ড ডিস্ককে সত্যিই এক অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং বলা চলে। এটি একই সাথে কয়েকশত সিডির মিউজিককে একটি ছোট বাক্সে সংরক্ষিত করার সুবিধা প্রদান করে, তবে এর কিছু অসুবিধাও রয়েছে। যেমন— এর প্লেটারে একটি ক্ষুদ্র বালুকণা পড়লেও এটি অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া এটি যেহেতু একটি Electro-mechanical ডিভাইস তাই এটির হেড চলতে চলতে কোন কারণে অকেজো হয়ে যেতে পারে, একে ডিস্ক ক্র্যাশ বা হেড ক্র্যাশ বলা হয়, আর এর ফলে আপনি হার্ডড্রাইভে থাকা সকল তথ্য হারিয়ে ফেলতে পারেন। তো আপনি যখন কোন ফাইল ওপেন করেন কিংবা কম্পিউটারে যে কোন কাজ করেন, তখন প্রত্যেকটি ডাটাকে হার্ড ডিস্ক বারবার খুঁজে বের করে দেয়।

ধরুন, আপনি কম্পিউটারে একটি Picture খুললেন, তো আপনার CPU হার্ডড্রাইভ ডিস্ককে বলে দেবে যে ঠিক কোথায় বা কোন সেক্টরে সেটিকে খুঁজতে হবে, এবার হার্ড ডিস্কে এর প্লেটারটি প্রচণ্ড জোরে ঘুরতে আরম্ভ করবে এবং প্রায় ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে ইমেজটিকে খুঁজে বের করে সিপিইউ এর কাছে পাঠিয়ে দেবে। আর একেই ডাটা রীড করা বলা হয়। সিপিইউ সেই ইমেজটি গ্রহণ করবে এবং আপনার স্ক্রীনে সেটিকে প্রদর্শিত করানোর জন্য প্রসেসিং করবে। এখন ইমেজটি এডিট করার কথা ভাবুন। আপনি কোন ইমেজকে যখন কোন ইমেজ এডিটিং সফটওয়্যারে ওপেন করে রাখেন তখন সেটি অলরেডি হার্ড ডিস্কে সেভ থাকে, কিন্তু যখন ইমেজটি এডিট সম্পূর্ণ করে করে নতুন করে সেভ করবেন তখন রীড-রাইট হেড আগের ইমেজটির অবস্থানে যাবে এবং এর উপরে নতুন ইমেজটির ডাটাকে ওভাররাইট করে দেবে, একে বলা হয় ডাটা ওভার রাইট প্রসেস।

হার্ডডিস্কের তথ্য ডিলিট করার পর যা ঘটে

ডাটা রিড রাইট তো বুঝলেন এইবার চলুন ডাটা মুছে ফেলা বা ডিলেট নিয়ে জানা যাক। আমরা প্রতিদিনই প্রচুর তথ্য রিড রাইট করার পাশাপাশি ডিলেট করেও থাকি। এখন কথা হচ্ছে এই ডিলেট করা ফাইল কোথায় যায় তাই তো? কোন ক্লিনার কর্মী এসে নিয়ে যায় না এই ডিলেট করা তথ্যগুলো আবর্জনা হিসেবে। আসলে আমরা যখন কোন তথ্য ডিলেট করি তখন হার্ড ডিস্কের ওই ডাটার উপর উচ্চ মাত্রায় UV রশ্মি ফেলা হয় মুছে ফেলতে। তাই তখন ওই স্থান হতে ডাটা গুলো হাল্কা হয়ে দুর্বল হয়ে যায়। কম্পিউটারে ডাটা গুলো ডিজিটাল (Binary) সিগন্যাল ০ এবং ১ আকারে থাকে। হার্ড ডিস্কে যখন UV রশ্মি ফেলে ডাটা মুছে ফেলা হয় তখন এই ০ এবং ১ এর রিড গুলো এতোটাই দুর্বল হয়ে যায় যে কম্পিউটার প্রসেসর সেগুলোকে আর কাউন্ট করতে চায় না। সাধারণত উচ্চ সিগন্যাল গুলোকে রিড করতেই প্রসেসর গুলোকে প্রোগ্রাম করা হয়। তো এই ভাবে একটা ডাটাকে মুছে ফেলা হয় হার্ড ডিস্ক থেকে।

কিন্তু মজার বিষয় হলো আপনি যখন কোন ডাটাকে ডিলেট করে রিসাইকেল বিনে পাঠান তারপর আবার চিরতরে ডিলেট করে দেন এই রিসাইকেল বিন থেকে তখন হার্ড ডিস্ক থেকে UV দ্বারা ডাটা মুছে গেলেও তা কিন্তু সম্পূর্ণ মুছে যায় না। ওই যে একটু আগে বললাম ডাটা সিগন্যাল গুলো জাস্ট দুর্বল হয়ে যায়। তাই কম্পিউটার প্রসেসর এই দুর্বল সিগন্যাল কে ইগনোর করে অনুমতি প্রদান করে হার্ড ডিস্কে ডাটা ওই স্থানে ওভার রাইট করার। এইভাবে আপনি যতবার ডাটা রাইট আর ডিলেট করবেন ততবার একই কাজ হবে এবং প্রতিবার ওই স্থানে ডিলেট হয়ে যাওয়া তথ্য গুলো দুর্বল সিগন্যালে পরিণত হবে। এই ডিলেট হয়ে যাওয়া ডাটা গুলোকে হার্ড ডিস্ক MFT ( master file table) কোড দ্বারা মনে রাখে। ফলে আপনি হাজার বার কিংবা কোটি বার ফাইল রাখেন আর ডিলেট করেন হার্ড ডিস্কের কোন যায় আসে না সেই মুহূর্তে।

তবে বিশেষজ্ঞগণের মতে একই স্থানে ৬০ ০০ ০০ ০০ ০০০ বারের বেশি তথ্য রাখা কিংবা মুছা হলে UV দ্বারা ওই স্পেস টি ব্যাড সেক্টোর হিসেবে পরিণত হয়। যাইহোক, আমার মনে হয় না কেউ এতবার তথ্য ওখানে রাখবে আর মুছবে। এর আগেই তার পিসি হয়তো স্বর্গে চলে যাবে ( হাহাহা ) । আমরা প্রায় শুনে থাকি যে ফাইল রিকোভারি দিয়ে ডিলেট হয়ে যাওয়া ডাটা/ ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে বা ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। আসলে এই মাস্টার ফাইল টেবিল দ্বারা এই কাজটা করা হয়। মাস্টার ফাইল টেবিল দ্বারা আপনি ডিলেট হয়ে যাওয়া যেকোনো ফাইল/ ডাটা ফিরিয়ে নিয়ে এসে আগের মত ব্যবহার করতে পারেন। তবে বেশি মাত্রায় এই ডাটা রিকোভারি বা ফাইল রিকোভারি সফটওয়্যার গুলো না ব্যবহার করাই ভালো।

পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডের তথ্য ডিলিট করার পর যা ঘটে

শুনলে হয়তো অবাক হবেন যে, পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ড কেনার সময় থেকেই পরিপূর্ণ লোড করা থাকে। এখানে লোড করা বলতে উক্ত মেমরি ডিভাইসটি বাইনারি ০ আর ১ দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে। আমরা এটাও জানি যে, যে কোন তথ্য মেমরি ডিভাইসগুলোতে বাইনারি ০ আর ১ আকারে সাজানো থাকে। ধরুন, আপনার কাছে যে পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডটি আছে সেটি কেবল মাত্র বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসলেন। যেহেতু এটা পরিপূর্ণ লোড আছে বললাম তাহলে মনে করুন এটার বাইনারি কম্বিনেশন ০১১১০০০০১০১০১১০০০১০১১ এরকম দেখতে। এই কম্বিনেশনটি জাস্ট আনলিংক করা আছে আপনার পিসির বা ফোনের সিপিউর সাথে ফলে দেখতে পাচ্ছেন না। এখন ধরুন উক্ত পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডে একটি ভিডিও ফাইল রাখবেন যেটার বাইনারি কম্বিনেশন মনে করুন ১০১০১০০১। তো, যখন এই ভিডিও ফাইলটি আপনার পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডে স্থানান্তর করছেন কপি বা কাট করে তখন পেনড্রাইভের এই ০১১১০০০০১০১০১১০০০১০১১ কম্বিনেশনটি চেঞ্জ হয়ে যাবে।

ফাইল বা ফোল্ডার ডিলিট করার পর যায় কোথায়

প্রথম দিকের কম্বিনেশনগুলো ১০১০১০০১ দ্বারা রিঅ্যারেঞ্জ হয়ে যাবে এবং সেটা সিপিউর সাথে লিংকিং করা থাকবে ফলে দেখতে পাবেন যে তথ্যটি আছে। লক্ষ করুন পুরো পেনড্রাইভটির মাত্র প্রথম দিকের কিছু বাইনারি কম্বিনেশন শুধু রিঅ্যারেঞ্জ হবে কারণ ভিডিও ফাইলটির বাইনারি সংখ্যা পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডের টোটাল সংখ্যা থেকে অনেক কম। পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডের যে বাইনারিগুলো রিঅ্যারেঞ্জ হবে সেটি হল দখলকৃত জায়গা আর বাকিগুলো হল ফাঁকা জায়গা। এখন যদি উক্ত ভিডিওটি ডিলিট করে দেন তাহলে ঐ বাইনারী কম্বিনেশন রয়েই যাবে, শুধুমাত্র সিপিউর সঙ্গে সেটার লিংকিং থাকবে না। ফলে দেখতে পাবেন না। এখন যদি নতুন করে কোন ফাইল উক্ত পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডে রাখেন তাহলে আগের ভিডিওর বাইনারি কম্বিনেশন পরের ফাইলের বাইনারি কম্বিনেশন দ্বারা রিঅ্যারেঞ্জ হয়ে যাবে যদি উক্ত পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা না থাকে। তো, একবার ফাইল ডিলিট করার পর যদি উক্ত পেনড্রাইভ বা মেমরি কার্ডে আর নতুন কিছু না রাখেন তাহলে আগের সকল ফাইলগুলোর লিংক ডেটা রিকভারি সফটওয়্যার দ্বারা পুনরায় লিংকিং করে যাবে ফলে আপনি ডিলিট হওয়া ফাইল ফিরে পাবেন।

পরিশেষে, বলবো যদি আপনারা কখনো আপনাদের পুরনো ডিভাইসে মেমোরি বা হার্ড ড্রাইভ কাউকে দেন বা বিক্রি করে দেন তাহলে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন তাতে আপনার কোন সিক্রেট সেনসিটিভ ডাটা আছে কি না। কারণ এগুলো আপনি যতই ভালো করে ডিলেট করুন না কেন তা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসার মত বর্তমান প্রযুক্তি যথেষ্ট এগিয়েছে। আমি পরামর্শ দিবো মেমোরি/ হার্ড ড্রাইভ কখনোই বিক্রি বা কাউকে দিবেন না এতে আপনি ভবিষ্যতে অন্তত ব্লাক মেইল হওয়ার হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবেন। আর আপনার যদি এই হার্ড ড্রাইভ বা মেমোরি গুলো একান্তই প্রয়োজন না হয় তাহলে এগুলো নষ্ট করে দিন বা ভেঙ্গে পুড়িয়ে ফেলুন। আজকের পোস্ট টি কেমন লাগলো তা অবশ্যই কমেন্টে জানাবেন। আর কিছু জানার থাকলে বা আমাদের কিছু জানানোর থাকলে অবশ্যই জানাবেন।

উপরোক্ত বিষয়টি পছন্দ হলে লাইক দিন, উপকারী মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।

comments

S.M. Sojib Ahmed

উপরোক্ত আর্টিকেলটি লিখেছেন | Email: smsojibahmed@gmail.com | Facebook: https://www.facebook.com/sojib.ahemed.5